ঢাকা ১২:১০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৯ মার্চ ২০২৫, ১৪ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

সোশ্যাল মিডিয়ায় গীবত, মিথ্যা ও গুজব এড়ানো: ইসলামি দৃষ্টিকোণ ও বাস্তবতা – বশির আহমদ

নিজস্ব সংবাদ :
  • আপডেট সময় ০৬:০০:৪৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৫
  • / ১০৬ বার পড়া হয়েছে

বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ মতামত প্রকাশ করছে, তথ্য আদান-প্রদান করছে। তবে এই প্ল্যাটফর্মগুলো যেমন জ্ঞানের প্রসার ও সামাজিক সংযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এখানে গীবত, মিথ্যা ও গুজব ছড়ানোও খুব সাধারণ ব্যাপার হয়ে উঠেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এসব বিষয় কতটুকু নিন্দনীয়, এবং এগুলো থেকে বাঁচার উপায় কী—এ নিয়েই কিছু লিখার চেষ্টা করছি।

#গীবত (পরনিন্দা) ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

★গীবতের সংজ্ঞা

গীবত বা পরনিন্দা হল, কারো অনুপস্থিতিতে তার দোষ-ত্রুটি উল্লেখ করা, যা সে শুনলে কষ্ট পাবে। রাসুল (সা.) গীবতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন:
“তুমি তোমার ভাইয়ের সম্পর্কে এমন কিছু বলছ যা সে অপছন্দ করে।”
সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, “যদি কথাটি সত্য হয়?”
রাসুল (সা.) বললেন:
“যদি তা সত্য হয়, তবে সেটাই গীবত, আর যদি মিথ্যা হয়, তবে সেটা অপবাদ (বুহতান)।” (মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৯)

★কুরআনে গীবতের নিন্দা

আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো তা ঘৃণা করো।” (সূরা হুজুরাত: ১২)

এ আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, গীবত করা এতটাই ঘৃণিত কাজ যে, এটি মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণের মতো জঘন্য।

#সোশ্যাল মিডিয়ায় গীবতের বাস্তবতা

কারো ছবি বা ভিডিও শেয়ার করে তার সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করা।

ব্যক্তিগত বিষয় বা পারিবারিক সমস্যা নিয়ে সমালোচনা করা।

অন্যের চরিত্রহননের জন্য ভিডিও, পোস্ট বা মিম বানানো।

এসব কাজ সমাজে বিদ্বেষ ও ঘৃণার জন্ম দেয়, যা ইসলাম কঠোরভাবে নিষেধ করেছে।

#মিথ্যা ও গুজব: ইসলামে নিষিদ্ধ

★মিথ্যার ভয়াবহতা

ইসলামে মিথ্যা বলা মারাত্মক গুনাহের কাজ। রাসুল (সা.) বলেছেন:
“মুনাফিকের তিনটি আলামত আছে: যখন কথা বলে, মিথ্যা বলে; যখন প্রতিশ্রুতি দেয়, ভঙ্গ করে; আর যখন তার কাছে কিছু আমানত রাখা হয়, তাতে খেয়ানত করে।” (বুখারি ও মুসলিম)

#কুরআনে মিথ্যার নিন্দা

“অতএব তোমরা মিথ্যা বলা থেকে বেঁচে থাক।” (সূরা হজ্জ: ৩০)

সোশ্যাল মিডিয়ায় মিথ্যার ভয়াবহতা

মিথ্যা সংবাদ বা ভুল তথ্য শেয়ার করা।

ফটোশপ বা এডিট করে ভুয়া ছবি-ভিডিও বানানো।

নিজেকে অন্য রূপে উপস্থাপন করা (যেমন: বয়স, পরিচয়, আর্থিক অবস্থা ইত্যাদিতে প্রতারণা করা)।

#গুজব ছড়ানোর ইসলামি বিধান

আল্লাহ বলেন:
“যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করো।” (সূরা হুজুরাত: ৬)

রাসুল (সা.) বলেছেন:
“কোনো ব্যক্তি শোনা কথা যাচাই না করে অন্যকে বললে, সেটাই তার জন্য মিথ্যা হওয়ার জন্য যথেষ্ট।” (মুসলিম, হাদিস: ৫)

#সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়ানোর বাস্তবতা

ভুয়া খবর ছড়িয়ে অরাজকতা তৈরি করা।

রাজনৈতিক বা ধর্মীয় উসকানি দেওয়া।

নামি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো।

গীবত, মিথ্যা ও গুজব থেকে বাঁচার উপায়

১. যাচাই-বাছাই করা

কোনো সংবাদ বা তথ্য পাওয়ার পর সেটি সত্য কিনা নিশ্চিত না হয়ে শেয়ার করা হারাম। আল্লাহ বলেন:
“যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না।” (সূরা বনী ইসরাঈল: ৩৬)

২. সংযমী ও সচেতন হওয়া

রাসুল (সা.) বলেন:
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে, সে যেন ভালো কথা বলে বা চুপ থাকে।” (বুখারি, হাদিস: ৬০১৮)

সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু শেয়ার বা মন্তব্য করার আগে ভাবা উচিত:

এটি সত্য নাকি মিথ্যা?

এতে কারো ক্ষতি হবে কি না?

এটি সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে কি না?

৩. অপরের প্রতি সদাচার ও দোয়া করা

যার প্রতি রাগ বা ক্ষোভ আছে, তার বদনাম না করে তার জন্য দোয়া করা উত্তম। আল্লাহ বলেন:
“তারা যখন কোনো অশ্লীলতা বা অন্যায়ের সম্মুখীন হয়, তখন ক্ষমা করে দেয়।” (সূরা শূরা: ৪০)

৪. আল্লাহর ভয় ও আখিরাতের চিন্তা করা

রাসুল (সা.) বলেন:
“যে ব্যক্তি আমাকে দুই চোয়ালের মাঝখানের (জিহ্বার) এবং দুই ঊরুর মাঝখানের (লজ্জাস্থানের) নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে, আমি তাকে জান্নাতের নিশ্চয়তা দেব।” (বুখারি, হাদিস: ৬৪৭৪)

সুতরাং, অযথা কথা বলা, মিথ্যা ও গীবত করা থেকে বেঁচে থাকা জান্নাতে যাওয়ার অন্যতম মাধ্যম।

শেষ কথা

সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। গীবত, মিথ্যা ও গুজব সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং আল্লাহর শাস্তির দিকে নিয়ে যায়। কুরআন ও হাদিসের আলোকে, আমরা যদি যাচাই-বাছাই করে কথা বলি, অন্যের দোষত্রুটি খোঁজার পরিবর্তে নিজেদের সংশোধন করি, তবে আমাদের ব্যক্তিগত জীবন ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে গীবত, মিথ্যা ও গুজব থেকে রক্ষা করুন এবং হালাল ও সত্য পথে চলার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লিখক পরিচিতি
মাওলানা মুফতি বশির আহমদ
অধ্যক্ষ উলুয়াইল ইসলামিয়া আলিম মাদরাসা, মৌলভীবাজার।
সংগঠক, সমাজকর্মী।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

সোশ্যাল মিডিয়ায় গীবত, মিথ্যা ও গুজব এড়ানো: ইসলামি দৃষ্টিকোণ ও বাস্তবতা – বশির আহমদ

আপডেট সময় ০৬:০০:৪৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৫

বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ মতামত প্রকাশ করছে, তথ্য আদান-প্রদান করছে। তবে এই প্ল্যাটফর্মগুলো যেমন জ্ঞানের প্রসার ও সামাজিক সংযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এখানে গীবত, মিথ্যা ও গুজব ছড়ানোও খুব সাধারণ ব্যাপার হয়ে উঠেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এসব বিষয় কতটুকু নিন্দনীয়, এবং এগুলো থেকে বাঁচার উপায় কী—এ নিয়েই কিছু লিখার চেষ্টা করছি।

#গীবত (পরনিন্দা) ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

★গীবতের সংজ্ঞা

গীবত বা পরনিন্দা হল, কারো অনুপস্থিতিতে তার দোষ-ত্রুটি উল্লেখ করা, যা সে শুনলে কষ্ট পাবে। রাসুল (সা.) গীবতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন:
“তুমি তোমার ভাইয়ের সম্পর্কে এমন কিছু বলছ যা সে অপছন্দ করে।”
সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, “যদি কথাটি সত্য হয়?”
রাসুল (সা.) বললেন:
“যদি তা সত্য হয়, তবে সেটাই গীবত, আর যদি মিথ্যা হয়, তবে সেটা অপবাদ (বুহতান)।” (মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৯)

★কুরআনে গীবতের নিন্দা

আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো তা ঘৃণা করো।” (সূরা হুজুরাত: ১২)

এ আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, গীবত করা এতটাই ঘৃণিত কাজ যে, এটি মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণের মতো জঘন্য।

#সোশ্যাল মিডিয়ায় গীবতের বাস্তবতা

কারো ছবি বা ভিডিও শেয়ার করে তার সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করা।

ব্যক্তিগত বিষয় বা পারিবারিক সমস্যা নিয়ে সমালোচনা করা।

অন্যের চরিত্রহননের জন্য ভিডিও, পোস্ট বা মিম বানানো।

এসব কাজ সমাজে বিদ্বেষ ও ঘৃণার জন্ম দেয়, যা ইসলাম কঠোরভাবে নিষেধ করেছে।

#মিথ্যা ও গুজব: ইসলামে নিষিদ্ধ

★মিথ্যার ভয়াবহতা

ইসলামে মিথ্যা বলা মারাত্মক গুনাহের কাজ। রাসুল (সা.) বলেছেন:
“মুনাফিকের তিনটি আলামত আছে: যখন কথা বলে, মিথ্যা বলে; যখন প্রতিশ্রুতি দেয়, ভঙ্গ করে; আর যখন তার কাছে কিছু আমানত রাখা হয়, তাতে খেয়ানত করে।” (বুখারি ও মুসলিম)

#কুরআনে মিথ্যার নিন্দা

“অতএব তোমরা মিথ্যা বলা থেকে বেঁচে থাক।” (সূরা হজ্জ: ৩০)

সোশ্যাল মিডিয়ায় মিথ্যার ভয়াবহতা

মিথ্যা সংবাদ বা ভুল তথ্য শেয়ার করা।

ফটোশপ বা এডিট করে ভুয়া ছবি-ভিডিও বানানো।

নিজেকে অন্য রূপে উপস্থাপন করা (যেমন: বয়স, পরিচয়, আর্থিক অবস্থা ইত্যাদিতে প্রতারণা করা)।

#গুজব ছড়ানোর ইসলামি বিধান

আল্লাহ বলেন:
“যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করো।” (সূরা হুজুরাত: ৬)

রাসুল (সা.) বলেছেন:
“কোনো ব্যক্তি শোনা কথা যাচাই না করে অন্যকে বললে, সেটাই তার জন্য মিথ্যা হওয়ার জন্য যথেষ্ট।” (মুসলিম, হাদিস: ৫)

#সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়ানোর বাস্তবতা

ভুয়া খবর ছড়িয়ে অরাজকতা তৈরি করা।

রাজনৈতিক বা ধর্মীয় উসকানি দেওয়া।

নামি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো।

গীবত, মিথ্যা ও গুজব থেকে বাঁচার উপায়

১. যাচাই-বাছাই করা

কোনো সংবাদ বা তথ্য পাওয়ার পর সেটি সত্য কিনা নিশ্চিত না হয়ে শেয়ার করা হারাম। আল্লাহ বলেন:
“যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না।” (সূরা বনী ইসরাঈল: ৩৬)

২. সংযমী ও সচেতন হওয়া

রাসুল (সা.) বলেন:
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে, সে যেন ভালো কথা বলে বা চুপ থাকে।” (বুখারি, হাদিস: ৬০১৮)

সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু শেয়ার বা মন্তব্য করার আগে ভাবা উচিত:

এটি সত্য নাকি মিথ্যা?

এতে কারো ক্ষতি হবে কি না?

এটি সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে কি না?

৩. অপরের প্রতি সদাচার ও দোয়া করা

যার প্রতি রাগ বা ক্ষোভ আছে, তার বদনাম না করে তার জন্য দোয়া করা উত্তম। আল্লাহ বলেন:
“তারা যখন কোনো অশ্লীলতা বা অন্যায়ের সম্মুখীন হয়, তখন ক্ষমা করে দেয়।” (সূরা শূরা: ৪০)

৪. আল্লাহর ভয় ও আখিরাতের চিন্তা করা

রাসুল (সা.) বলেন:
“যে ব্যক্তি আমাকে দুই চোয়ালের মাঝখানের (জিহ্বার) এবং দুই ঊরুর মাঝখানের (লজ্জাস্থানের) নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে, আমি তাকে জান্নাতের নিশ্চয়তা দেব।” (বুখারি, হাদিস: ৬৪৭৪)

সুতরাং, অযথা কথা বলা, মিথ্যা ও গীবত করা থেকে বেঁচে থাকা জান্নাতে যাওয়ার অন্যতম মাধ্যম।

শেষ কথা

সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। গীবত, মিথ্যা ও গুজব সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং আল্লাহর শাস্তির দিকে নিয়ে যায়। কুরআন ও হাদিসের আলোকে, আমরা যদি যাচাই-বাছাই করে কথা বলি, অন্যের দোষত্রুটি খোঁজার পরিবর্তে নিজেদের সংশোধন করি, তবে আমাদের ব্যক্তিগত জীবন ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে গীবত, মিথ্যা ও গুজব থেকে রক্ষা করুন এবং হালাল ও সত্য পথে চলার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লিখক পরিচিতি
মাওলানা মুফতি বশির আহমদ
অধ্যক্ষ উলুয়াইল ইসলামিয়া আলিম মাদরাসা, মৌলভীবাজার।
সংগঠক, সমাজকর্মী।