কুয়াশা ভেদ করে দৌড়: প্রকৃতির কোলে রাজকান্দি হিল ২৫কে ম্যারাতন —– বিজিত দত্ত
- আপডেট সময় ০৯:০৩:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
- / ২ বার পড়া হয়েছে

সিলেট বিভাগ—প্রকৃতির সৌন্দর্যের অনন্ত এক কবিতা। পাহাড়, টিলা, বন, নদী আর চা-বাগানের সবুজ অক্ষরে লেখা এই জনপদ যেন সৃষ্টিকর্তার এক গভীর মনোযোগে আঁকা শিল্পকর্ম। আর সেই শিল্পকর্মের ক্যানভাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল রঙটি ছড়িয়ে আছে মৌলভীবাজার জেলাজুড়ে। এই জেলার বুকেই কমলগঞ্জ—যাকে নির্দ্বিধায় বলা যায় সৌন্দর্যের আঁতুরঘর, প্রকৃতির গোপন নীল দরজা।
এই কমলগঞ্জেই, আলিনগর চা-বাগান সংলগ্ন যোগীবিল এলাকায়, প্রকৃতির বুকে এক অনন্য মানবিক উৎসব হয়ে গেল—রাজকান্দি হিল ম্যারাথন ২৫ কিলোমিটার। এটি শুধু একটি দৌড়ের আয়োজন ছিল না; এটি ছিল মানুষ, প্রকৃতি আর স্বপ্নের সম্মিলিত যাত্রা।
যেখানে দৌড় শুরু হয় নীরবতা থেকে ম্যারাথনের আগের দিন থেকেই যোগীবিল এলাকায় অন্যরকম এক স্পন্দন। সন্ধ্যার আলো নামতেই রানারদের কণ্ঠে কণ্ঠে ভরে ওঠে চারপাশ। কিট সংগ্রহ চলেছে সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত। অচেনা মানুষরা পরিচিত হয়ে উঠছিলেন একটিমাত্র সূত্রে—দৌড়। মধ্যরাতের নীরবতা ভেঙে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। কোথাও ক্লান্তি নেই, কোথাও বিরক্তি নেই—শুধু অপেক্ষা, উত্তেজনা আর আনন্দ।
রানারদের জন্য ডিনারের আয়োজন ছিল নিখুঁত। আয়োজকদের আন্তরিকতায় বোঝা যাচ্ছিল—এটি কেবল দায়িত্ব নয়, ভালোবাসার আয়োজন।
ভোরের কুয়াশা আর মানুষের উচ্ছ্বাসে ৯ জানুয়ারির ভোর। শীতের কুয়াশা তখনো যোগীবিলকে জড়িয়ে রেখেছে। আকাশ ধীরে ধীরে আলো নিচ্ছে। ভোরের সেই নিস্তব্ধ মুহূর্তে শতশত রানারের উপস্থিতিতে প্রকৃতি যেন জেগে উঠল নতুনভাবে। ভোর ৬টা ৩০ মিনিট—উচ্ছ্বাস, করতালি আর হৃদস্পন্দনের শব্দে শুরু হলো রাজকান্দি হিল 25k ম্যারাথন।
কল্পনা করুন—চা-বাগানের সরু পথ ধরে শতশত মানুষ দৌড়াচ্ছে। চারপাশে সারি সারি চা-গাছ, দূরে টিলার ঢাল, ওপর দিয়ে ভেসে যাওয়া কুয়াশা। প্রতিটি শ্বাসে প্রকৃতির বিশুদ্ধতা। প্রতিটি পদক্ষেপে দৃঢ় প্রত্যয়।
পথে পথে যত্ন, ভালোবাসা আর শক্তির উৎস
এই ম্যারাথনে দৌড় ছিল কঠিন, কিন্তু ব্যবস্থাপনা ছিল নির্ভরতার। পথজুড়ে ছিল পর্যাপ্ত হাইড্রেশন ক্যাম্প। অফুরন্ত স্যালাইন, ফলমূল, শক্তিবর্ধক খাবার—রানারদের শরীর ও মন দুটোকেই সচল রাখতে কোনো কিছুর কমতি ছিল না। আয়োজকদের পরিকল্পনা আর স্থানীয় মানুষের আপ্রাণ সহযোগিতায় পুরো পথজুড়ে তৈরি হয়েছিল নিরাপত্তা ও স্বস্তির এক নির্ভরযোগ্য বলয়।
আমি নিজেও এই ম্যারাথনের একজন অংশগ্রহণকারী ছিলাম। জীবনে বহু ম্যারাথনে দৌড়েছি, শহরের পিচঢালা রাস্তা থেকে শুরু করে পাহাড়ি ট্রেইল—কিন্তু রাজকান্দি হিল ম্যারাথন ছিল ভিন্ন। এখানে প্রতিযোগিতার চেয়ে বড় ছিল অনুভব। দৌড়াতে দৌড়াতে মনে হচ্ছিল—আমি প্রকৃতির সাথে কথা বলছি, আমি নিজের সীমার সাথে পরিচিত হচ্ছি।
এটি ছিল এমন এক আয়োজন, যেখানে কোথাও বিশৃঙ্খলা নেই, কোথাও অবহেলা নেই। শতভাগ সফল—এই শব্দটি হয়তো কম পড়ে।
দৌড় শেষে উৎসবের আবহে ছিল রানারদের জন্য লাঞ্চের আয়োজন। এটি কোনো সাধারণ খাবার নয়—এটি ছিল আন্তরিক আপ্যায়ন। খাবারের বৈচিত্র্য, পরিমাণ আর পরিবেশনায় বোঝা যাচ্ছিল—রানাররা এখানে অতিথি, বোঝা নয়। সত্যিকার অর্থেই এক ভূড়িভোজ।
এরপর আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত—ফিনিশার মেডেল। প্রতিটি মেডেল যেন একটি গল্প, একটি সংগ্রামের স্মারক। ক্লান্ত শরীরে মেডেল পরার মুহূর্তে চোখে মুখে যে তৃপ্তি—তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
একটি দৌড়, বহু সম্ভাবনা
রাজকান্দি হিল ম্যারাথন প্রমাণ করেছে—বাংলাদেশের প্রান্তিক জনপদেও আন্তর্জাতিক মানের আয়োজন সম্ভব। প্রয়োজন শুধু স্বপ্ন, পরিকল্পনা আর মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা।
এই ম্যারাথন কেবল একটি ইভেন্ট নয়; এটি কমলগঞ্জের পরিচয়কে তুলে ধরেছে, মৌলভীবাজারের সম্ভাবনা আর বাংলাদেশের ট্রেইল রানিংয়ের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যোগীবিল সেদিন শুধু একটি এলাকা ছিল না—সে ছিল দৌড়ের কবিতা, প্রকৃতির মঞ্চ, আর মানুষের অদম্য ইচ্ছার সাক্ষী।
কুয়াশা সরে গেছে, দৌড় শেষ হয়েছে—কিন্তু রাজকান্দি হিল ম্যারাথনের স্মৃতি থেকে যাবে বহুদিন, বহু মানুষের হৃদয়ে।

















