শিশু ভিক্ষাবৃত্তি সমাজের অভিশাপ

264

মানুষের অধিকার ফাউন্ডেশন: মৌলভীবাজার জেলায় শিশু ভিক্ষুকের হাড় বেড়েছে। একটি শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ। শিশুরা যদি শিক্ষা গ্রহন না করে থাহলে তাহাদের মননশীলতা বাধাগ্রস্হ হয়। একটি শিশুর শৈশবকাল ভিক্ষাবৃত্তিতে অতিবাহিত কিংবা ভিক্ষাবৃত্তি জীবিকার মাধ্যম হতে পারে না। বিক্ষাবৃত্তি মানবাধিকার ও শিশু অধিকারের লঙ্ঘন। সমাজের অসংখ্য শিশু ভিক্ষা করে জীবন ধারণ করছে এবং এ সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ভিক্ষাবৃত্তির কাজ যখন শিশু বয়স থেকে শুরু হয়, তখন আমরা বুঝতে পারি সমাজে শিশুদের প্রতি কত অবহেলা।

বিবেজনার বিষয় হল, কেন তারা ভিক্ষা করছে। তাদের কী সমস্যা। কে তাদের এই পথে নিয়ে আসছে। কিছু সংঘবদ্ধ চক্র শিশুদের ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করে ব্যবসা করছে। শিশুরা সমাজের অনিয়ম ও বৈষম্যের শিকার। শিশুদের মানসিকভাবে বিকাশের সুযোগের বৈষম্য রয়েছে। দেশে লাখ লাখ কর্মজীবী শিশু রয়েছে। তাই এ বিষয়ে আমাদের সবাইকে গভীরভাবে ভাবতে হবে। শিশুদের ভিক্ষাবৃত্তি এখনই বন্ধ হওয়া উচিত। এমতাবস্থায়, কেবলমাত্র বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অথবা সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এককভাবে এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভবপর নয়। পেশাজীবী, সুশীল সমাজ, নীতিনির্ধারক, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসহ সবার সম্মিলিত প্রয়াসই কেবল এই অমানবিক ভিক্ষাবৃত্তি থেকে শিশুদের রক্ষা করতে পারে।

“মানূষের অধিকার ফাইন্ডেশন, মৌলভীবাজার অবহেলিত মানুষের জন্য এবং এ বিষয় নিয়ে কাজ পরিকল্পনা করছে। দারিদ্র, নির্যাতনসহ ভিক্ষাবৃত্তির হয়তো বিভিন্ন কারণ রয়েছে। আমরা জাতিতে একটু বেশি আবেগপ্রবণ। একজন শিশু যখন কারও কাছে ভিক্ষা চায়, তখন আমরা অনেকেই তাকে সহানুভূতি থেকে ভিক্ষা দিই। অনেক দরিদ্র মা-বাবা শিশুদের সঙ্গে নিয়ে ভিক্ষা করে। কারণ, বড়দের থেকে মানুষ শিশুদের বেশি ভিক্ষা দেয়। এভাবে আমরা অনেকে হয়তো শিশু ভিক্ষাকে উৎসাহিত করছি। অনেকে শিশুদের ভাড়া করে এনেও ভিক্ষাবৃত্তির কাজ করায় বলে প্রমান আছে। ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন কনভেনশনেও ভিক্ষাবৃত্তিকে কোনোভাবে সমর্থন করেনা। শিশু ভিক্ষুকদের মধ্যে কেহ বলছে তারা ইচ্ছা করে ভিক্ষা করে আবার কেহ বলছে, তাহারা কেন ভিক্ষা করছে তা জানে না। অর্থাৎ, কেউ না কেউ তাকে ভিক্ষা করতে বাধ্য করছে। এরা প্রতিদিন ৫০ থেকে ২০০ টাকা করে পায়। তাহাদের পিতা মাতা আয়ের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করছে তাহাদরে ছেলে সন্তানকে। এ জন্য তাদের মা- বাবাকে প্রথমে এ বিষয়ে মানষিক প্রশিক্ষন দিতে হবে।

ভিক্ষাবৃত্তির বদলে লেখাপড়া করতে আগ্রহী এমন শিশু ভিক্ষুকের সংখ্যাই বেশী অর্থাৎ ৬১.১৬% । শিশু ভিক্ষুকের -মধ্যে কেউই সরকারী সহায়তা পায়না । শিশু ভিক্ষুকের মধ্যে সবাই সরকারী সহায়তা পেলে ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়তে আগ্রহী। সংবিধান ও সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণাপত্র অনুযায়ী প্রত্যেক মানুষের রয়েছে সুন্দর জীবন যাপনের অধিকার। কিন্তু এই শিশু ভিক্ষুক জরিপ করা অবস্থায় শিশুদের সাথে কথা বলে আমরা জানতে পারি সুন্দর জীবন অতিবাহিত করা তাদের জন স্বপ্নমাত্র। ন্যুনতম মৌল মানবিক চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে তারা চরমভাবে বঞ্চিত ।

ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ ও ভিক্ষুক পুনর্বাসনে সরকারের এখন কোনো প্রকল্প নাই। ফলে একদিকে যেমন ভিক্ষুকের সংখ্যা কমছে না, অন্যদিকে ভিক্ষাবৃত্তি ঘিরে তৈরি হওয়া সিন্ডিকেট বহাল তবিয়তে ব্যবসায় করে যাচ্ছে। কিছু কিছু এলাকায় রয়েছে মৌসুমি ভিক্ষুক। যেমন কবরস্থানের সামনে প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের আগে জড়ো হন প্রায় অর্ধশত ভিক্ষুক, যাহাদের একটি বড়ো অংশই ভিক্ষা করেন সপ্তাহে ঐ একটি দিন। ইহা ছাড়াও অনেকেই আছেন যাহারা শারীরিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কাজ না করিয়া বিভিন্ন অজুহাতে ভিক্ষাকেই অর্থ উপার্জনের উপায় হিসাবে বাছিয়া লইয়াছেন।

শিশু ভিক্ষাবৃত্তি একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য ভালো ভাবমূর্তি তৈরি করে না। কেননা, সমাজে ভিক্ষাবৃত্তি করিবার মতো অতি দরিদ্র শিশু থাকিলে তাহা রাষ্ট্রের জন্যও লজ্জার। ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ট্রাফিক পুলিশের চোখের সামনেই শিশুদের দিয়া এমন নির্মম ব্যবসায় চালাইলেও কেহ কিছু বলিতেছে না। তাছাড়া একটি জরিপে দেখা গিয়াছে, আমাদের দেশে কর্মজীবী শিশুদের মধ্যে ৫৫ শতাংশ শহরে বাস করে। আবার এই ৫৫ শতাংশের মধ্যে ৯ শতাংশ শিশু ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িত। সুতরাং শিশুদের ভিক্ষুক বানানোর কারিগরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা লইতে হইবে। তাহা ছাড়া, ভিক্ষুক নির্মূলে কার্যকর প্রকল্প বা কর্মসূচি গ্রহণ করিতে হইবে।

আইনে নিষিদ্ধ থাকার পরও অবাধে চলছে বিকলাঙ্গ, মানষিক ভারসাম্যহীন, প্রতিবন্ধী ও ছোট্ট পথশিশুদের নিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি বাণিজ্য। শহরের রাস্তা-ঘাট, ফুটপাত, সমুদ্র সৈকত এলাকা, বিভিন্ন হোটেল-মোটেলের সম্মুখে, রেঁস্তোরা ও পর্যটনমুখী বিভিন্ন স্পটে ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে এসব শিশুদের ভিক্ষাবৃত্তি। এতে অস্বস্তিতে রয়েছেন জেলায় বেড়াতে আসা পর্যটক ও সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় সচেতন সমাজ। এতে সৌন্দর্য্যহীনতার পাশাপাশি পর্যটন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত শহরের ভাবমুর্তি বিনষ্ট হচ্ছে চরমভাবে। অভিযোগ রয়েছে, ভিক্ষাবৃত্তির কাজে ব্যবহৃত এসব শিশুরা ভিক্ষার জন্য প্রতিনিয়ত উত্যক্ত করে থাকেন জেলায় বেড়াতে আসা পর্যটকদের। আবার বিভিন্ন অফিস-আদালতেও কমতি নেই এসব ভিক্ষার কাজে ব্যবহৃত শিশুদের। এই শিশুদের স্বাভাবিক জীবনের স্রোতে ফিরিয়ে আনার জন্য নিম্নে কিছু সুপারিশ উল্লেখ করা হল । সুপারিশ্ মালাঃ

১) শিশু ভিক্ষুকদের পরিবারের সদস্যদের আয় বৃদ্ধি বা আর্থিক অবস্থার উন্নতি করতে হবে ।

২) এতিম বা দুঃস্থ শিশুদের জন্য সরকারিভাবে ভাতা প্রদানের ব্যাবস্থা করতে হবে ।

৩) উচ্ছেদ আতঙ্ক থেকে রক্ষার জন্য এই সকল শিশুদের সুষ্ঠু পুনর্বাসন স্থান নির্ধারণ করা ।

৪) শিশু ভিক্ষুকদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের আওতাভুক্ত করতে হবে ।

৫) ভবঘুরে আইন, ১৯৪৩-এর ১৯ ধারা অনুসারে ভিক্ষুক হিসেবে শিশুদের নিয়োজিত করলে তার শাস্তি দুই বৎসর পর্যন্ত মেয়াদের সশ্রম কারাদন্ড বা অর্থদন্ড বা উভয় প্রকার দন্ডই হতে পারে । যিনি কোন শিশুর হেফাজত, দায়িত্ব বা তত্ত্বাবধানে থাকাকালে শিশুকে ভিক্ষাবৃত্তিতে উৎসাহিত করেন তিনি এবং যে শিশুকে ভিক্ষা করতে বাধ্য করে উভয়েই শাস্তি পাবে এই আইনকে বাস্তবায়নের রুপ দিতে হবে।

৬) শিশু ভিক্ষুকদের শিক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের আওতাভুক্ত করতে হবে ।

৭) সামাজিকভাবে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

৮) শিশুদের ভিক্ষা প্রদানে বিরত থাকতে হবে।

তথ্য সংগ্রহে ও লেখক:

এড.নিয়ামুল হক

প্রতিষ্টাতা চেয়ারম্যান

মানুষের অধিকার ফাউন্ডেশন,

মৌলভীবাজার।